৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:৩০
শিরোনাম:

সৈয়দ আতিকুর রব : ভারত-চীন যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে !

সৈয়দ আতিকুর রব : চীন এবং ভারতের মধ্যে কনভেশনাল সম্মুখ লড়াই হয়েছিল ১৯৬২ সালে কিন্তু ঐ যুদ্ধের পর বিগত দশকগুলোতে এশিয়ার এই দু’ই দেশ বিপুল সমরাস্ত্র সম্ভার গড়ে তুলেছে। পরমাণু শক্তিধর দু’ই দেশের মধ্যে বৈরিতাও বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ ২০১৭ সালে এই দু’ই দেশ সীমান্ত সংকট নিয়ে বিভাদে জড়িয়েছিল ডোকলা মে সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে চীনের সঙ্গে ভারতের বিরাজমান সেই সীমান্ত সংকট প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড টানাপড়েনে চলার পর কোন রকম রক্তপাত ছাড়াই সমাধান হয়েছিল আলোচনার টেবিলে ।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বেশ কিছু দিন সীমান্ত নিয়ে দু’ই দেশের মধ্যে বিরোধ না হলেও চলতি বছরে লাদাখ সীমান্তে ভারত কর্তৃক রাস্তা তৈরী করাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আবারো উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে সীমান্তে । যার ফলে সীমান্তে সামরিক শক্তির মওজুদ বাড়িয়েছে দিল্লী এবং বেইজিং । গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশ দুটির সেনারা সীমান্তে মুখোমুখি অবস্হানে থাকলেও ছোট খাটো হাতাহাতি এবং ধস্তাদস্তি ছাড়া তেমন কোন ঘটনার থবর পাওয়া যায়নি । তবে গত সোমবার রাতে লাদাখের উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে অনুষ্টিত একটি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পর্যায়ের মিটিং চলাকালীন সময়ে এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে উভয় দেশের সেনারা শারিরীক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে । যাহার ফলে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যেকার সোমবার রাতের সেই সংঘর্ষে দু’পক্ষের বেশ কয়েকজন সেনা হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে ।

ভারত সহ আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলে ও দু’ই দেশের কমপক্ষে ৫০ জনের বেশি সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন সেটা অনুধাবন করা যাচ্ছে । যেখানে কর্ণেল পদ মর্যাদার একজন ভারতীয় সেনা অফিসার রয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাদাখ অঞ্চলে চীন এবং ভারতের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । পাল্টাপাল্টি হুশিয়ারিতে দুই’ দেশ যে কোন সময় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে ।

বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবশালী এই দু’ই দেশের মধ্যে যদি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তবে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে ? বিশ্ব পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোই বা কে কার পক্ষ নিবে? যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা অন্য ক্ষমতাধর দেশগুলোর ভূমিকা কেমন হবে? বাংলাদেশ কোন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারে? এই ধরণের প্রশ্নগুলো এখন ঘোরপাক খাচ্ছে অনেকের মাথায় ।

অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত দেশ দু’ই দেশ যদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে অন্য দেশগুলোর ওপর এর বারুদের প্রভাব পড়তে পারে এবং বিশেষ করে এশিয়ায় এর বিরুপ অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে ।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহমুদ আলি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র দেশগুলো যেমন- জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল এবং ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বেশ ভালো সস্পর্ক গড়ে উঠেছে ।ভারতের সঙ্গে এসব দেশের সামরিক সহযোগিতা বেশ ঘনিষ্ঠ।কাজেই এসব দেশ হয়তো রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিকভাবে ভারতকে সমর্থন দেবে।

অন্যদিকে চীনের সেরকম আন্তর্জাতিক মিত্র নেই। রাশিয়া চীনের বন্ধুরাষ্ট্র, কিন্তু মনে রাখতে হবে অতীতে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতেরও ঘনিষ্ঠ মৈত্রী ছিল। ১৯৬২ সালে রাশিয়া কিন্তু চীনের বদলে ভারতকেই সমর্থন করেছিল। কাজেই করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে প্রত্যেকটি দেশ তাদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাবে নিজেদের স্বার্থে ।

যুদ্ধ শুরু হলে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরেক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান যে চীনের পক্ষ নিবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে চীনের পরিক্ষিত বন্ধু এবং তাদের চিরশক্র ভারতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার এটি হবে মূখ্য সুযোগ । তবে জটিল অবস্থায় পড়তে পারে বাংলাদেশ। বৃহৎ এই দুটি দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুসর্ম্পক রয়েছে বাংলাদেশের ।

চীন এবং ভারতের মধ্যে যদি যুদ্ধ হয়, তখন সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়ার জন্য কি চাপ বাড়বে বাংলাদেশের ওপর? এ প্রসঙ্গে মাহমুদ আলি বলেন, এ ধরনের একটা চাপ গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ওপর আছে। যেমন- ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন যে চীনের সাহায্যে তারা চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করবেন। এই প্রস্তাব যখন বাংলাদেশ চীনের কাছে দেয়, তখন চীন সেটি গ্রহণ করেছিল। এই বন্দর নির্মাণে বাংলাদেশের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র,ভারত এবং জাপানের চাপের মুখে বাংলাদেশকে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে হয়। পরে জাপানের সাহায্য নিয়ে চট্টগ্রামে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে বাংলাদেশ ।

এই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে, এ ধরনের চাপ কিন্তু বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরেই অনুভব করছে। এটার মোকাবেলায় বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে তাদের সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছে। তবে যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি যে বেশ জটিল হয়ে পড়বে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

তিনি বলেন, বিগত দিন গুলোতে সাব মেরিন সহ বাংলাদেশের অনেক সমরাস্ত্র এসেছে চীন থেকে। বাংলাদেশি সেনা অফিসাররা চীন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ কিন্তুু সেটা রাজনৈতিক সম্পর্ক বলে মনে করেন মাহমুদ আলি। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত ভারত থেকে সে পরিমাণ সমরাস্ত্র কেনেনি বাংলাদেশ ।কাজেই এটা একটা জটিল সম্পর্ক। এর সাথে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতি- সব বিষয় সম্পৃক্ত।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো সীমিত আয়ের বৃহৎ জনগোষ্টীর দেশ হিসেবে যার চীন এবং ভারত দু’দেশের সঙ্গেই রয়েছে সুসম্পর্ক, তার জন্য পক্ষ নেবার সিদ্ধান্ত বেশ জটিল একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে সেই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

Loading