৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৮:৪৯
শিরোনাম:

সনদ জটিলতায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারছেন না শিক্ষানবিস আইনজীবীরা

রুকসানা আক্তার। গ্রামের বাড়ি বরিশাল। মাকে নিয়ে থাকেন ঢাকার আজিমপুরে। ইডেন কলেজ থেকে ২০১৪ সালে সমাজকর্মে মাস্টার্স পাশ করেছেন। অনার্স শেষ করার পরই মাস্টার্সের সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবিও শেষ করেন। এরপর ঢাকা বারে একজন সিনিয়রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বারকাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০১৭ সালে এমসিকিউ পাশ করেন। তবে লিখিত পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হওয়ায় খাতা দেখতে চেয়ে আন্দোলন করেন।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বারকাউন্সিল আন্দোলনে সাড়া না দিলেও এমসিকিউ আর দিতে হবে না বলে বিধান করেন। বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে চলছেন কোন রকমে। তিন বোন দুই ভাই গ্রামে সংসার করলেও তার সেটা হয়নি। আইনজীবী হওয়ার পর বিয়ে করার স্বপ্ন ছিল রুকসানার। তবে পরীক্ষা জটিলতায় সেটা এখনো সম্ভব হয়নি।

রুপেশ বড়ুয়া। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাশ করার পর ঢাকা বারে শিক্ষানবিস হিসেবে নাম লিখিয়ে ২০১৬ সালে বারকাউন্সিলে তালিকাভুক্তির জন্য কাগজ-পত্র জমা দেন। ২০১৭ সালে এমসিকিউ পরীক্ষা দিয়ে তাতে উত্তীর্ণ হলেও লিখিত পরীক্ষায় কাঙ্খিত ফল না আসায় খাতা দেখতে চেয়ে আন্দোলন করেন। তবে তাতে সাড়া মেলেনি।

রুপেশের পরিবারে বাবা-মা ও ছোট ভাই রয়েছে। তারা থাকনে চট্টগ্রামে। তিনি ঢাকায় মেসে থাকেন। সিনিয়রের কাছ থেকে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে কোন রকমে চলতে হয়। পরিবারকে সহযোগিতা তো দূরে থাক, নিজেকেই প্রায় সময়ই না খেয়ে থাকতে হয়। মহামারির কারণে আদালত বন্ধ থাকায় আয় বন্ধ। মেস ভাড়া না দিতে পারায় কথা শুনতে হচ্ছে বাড়ি ওয়ালার। ছোট ভাই ২০১৭ সালে বিয়ে করে। তার বয়স ৩১ পার হতে চলেছে। কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় ছোট ভাইয়ের বিয়ের কথাও পরিবার থেকে জানানো হয়নি রুপেশকে।

শামিমুর রেজা রনি। নওগাঁ বারের শিক্ষানবিস আইনজীবী। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে ২০১৫ সালে বারকাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পাস হয়নি। এরপর ২০১৭ সালে আবারো পরীক্ষা দিয়ে এমসিকিউ উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে লিখিত পরীক্ষায় আসেনি কাঙ্খিত ফল। বিয়ে করেছেন ২০১২ সালে। স্ত্রী গৃহিনী। মা বাড়িতে থাকলেও বাবা বেঁেচ নেই।

শামিমুর বলেন, বাবা আমার চিন্তায় হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। বার কাউন্সিলে কাগজ-পত্র জমা দেওয়ার সময় হলফনামা দিতে হয়েছে, অন্য কোন পেশায় জড়িত নই মর্মে। দীর্ঘদিন ধরে কোর্টে গেলেও আইনজীবী না হওয়াটা বিড়ম্বনার। কোর্টে গেলে নানা রকম অপমান-অপদস্থ হতে হয়। আয়ের উৎস কেবল সিনিয়র ভালবেসে যা দেন। কিন্তু এ সামান্য টাকা দিয়ে তো চলে না। অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। আয় নেই দেখে এখনো পর্যন্ত সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবতে পারিনি।

মাহতাব হোসেন। ঢাকা বারে ২০১৫ সালে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এলএলবি পাশ করে ২০১৫ সালে এমসিকিউ উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে লিখিত খারাপ হয়। ২০১৭ সালে আবারো এমসিকিউ দিয়ে পাশ করেন। তবে লিখিত পরীক্ষা দিলেও রেজাল্ট আসেনি।

গ্রামের বাড়ি বরিশাল। স্ত্রী গৃহিনী। এক ছেলে অনার্সে পড়ছে। মাহতাব বলেন, সিনিয়র যা দেন তা দিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। সবার পরিচয় আছে। কিন্তু আমাদের কোন পরিচয় নেই। বারকান্সিলে হলফনামা দিয়ে আসতে হয়, অন্য কোন পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে না। তাহলে আমরা এখন কী করবো? বার কাউন্সিলের পরীক্ষা জটিলতায় আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

কেবল রুকসানা আক্তার, রুপেশ বড়ুয়া, শামিমুর রেজা বা মাহতাব হোসেনই নন। এরকম শত শত শিক্ষানবিস আইনজীবী রয়েছেন সারা দেশে। এদেরকে কেবল তার সিনিয়রের ওপরই নির্ভর করে চলতে হয়। সিনিয়র যখন যা খুশি তাই দেন। সনদ হয়ে গেলেই পাবেন পেশাগত ও সামাজিক স্বীকৃতি। পরিচয় দিতে পারবেন সবার কাছে। তখন আর দশজনের মতো বিয়ে করে সংসার করার স্বপ্ন তাদের। তবে সনদ জটিলতায় বয়স পার হয়ে গেলেও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারছেন না অনেকে।

এদিকে যারা পরিবারের প্রভাব খাটিয়ে বিয়ে করেছেন তারা রয়েছেন আরও বেশি সমস্যায়। কেন না অবিবাহিতরা কেবল নিজের চিন্তা করলেও বিবাহিতদের ভাবতে হচ্ছে পরিবার নিয়ে। বাড়তি আয় না থাকলেও বাড়তি খরচের বোঝা ঘাড়ে। তা ছাড়া দীর্ঘদিন কোর্টে গিয়ে আইনজীবী পরিচয় দিতে না পারাটা তাদের জন্য চরম লজ্জাজনক বলেও জানান শিক্ষানবিসরা।

তাদের মধ্যে এমসিকিউ উত্তীর্ণদের একটি অংশ বাকি পরীক্ষা ছাড়াই গেজেট করে সনদের দাবি তুলেছেন। এ দাবিতে তারা সারা দেশে স্মারকলিপি দেয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট চত্ত্বর ও সব শেষে বারকাউন্সিলের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে প্রতিদিন অবস্থান করে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

তবে জানতে চাইলে বারকাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, এমসিকিউ উত্তীর্ণদের লিখিত পরীক্ষা নেয়ার জন্য একটি তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। তবে মহামারি কোভিডের কারনে সেটা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা ছাড়া সনদ দেয়ার সুযোগ নেই। এনরোলমেন্ট কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, পরিস্থিতি ভাল হলে সেপ্টেম্বরে পরীক্ষা নেওয়া চিন্তা রয়েছে বলে জানান তিনি।

বারকাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সময়মতো পরীক্ষা না নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষানবিসদের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এটা বারকাউন্সিলের বর্তমান কমিটির চরম ব্যর্থতা এবং খুবই অন্যায়। আমি বলবো যতটা সম্ভব পরীক্ষাগুলো নিয়মিত করার জন্য।

তিনি বলেন, বারকাউন্সিল অ্যাক্ট সংশোধন করে বিচারপতিদদেরকে এনরোলমেন্ট কমিটিতে নেওয়া হলো। কিন্তু তারা অনেক ব্যস্ত, সময় দিতে পারেন না। এছাড়া বারকাউন্সিলের বর্তমান কমিটিতে যারা রয়েছেন পরীক্ষা নিতে না পারায় তারাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এটাকে তাদের অযোগ্যতা বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এর সমাধানের পরামর্শ দেন জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।

Loading