৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১২:৪০
শিরোনাম:

বিমানবন্দরে এয়ার কার্গোতে চাকরি দেয়ার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার আরেক প্রতারক লালু গ্রেপ্তার

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার কার্গোতে চাকরি দেয়ার নামে প্রায় শতাধিক প্রার্থীর কাছে থেকে দুই থেকে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে আমিনুর ইসলাম লালু (৪২) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মঙ্গলবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার লালুকে তিনদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করছে সিআইডি।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বুধবার লালুকে গ্রেপ্তারের খবর জানতে পেরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে জড়ো হন প্রতারণার শিকার অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন ব্যক্তি। তারা এ সময় লালুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিসহ সিআইডি কর্মকর্তাদের কাছে লালুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।

সিআইডি বলছে, প্রতারণার জন্য লালু একের পর এক ভুয়া কোম্পানি খুলেছেন। সেখানে টাকার বিনিময়ে লোক নিয়ে তাদের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার কার্গো বিভাগে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ মো. রেজাউল হায়দার বলেন, প্রতারক লালু এনবিজি এয়ার কার্গো লিমিটেড, নর্থ বেঙ্গল আউটসোর্সিং লিমিটেড, বগুড়া ডেভেলপার অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, বগুড়া ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স হযরত শাহ্ আলী বোগদাদী (রা.) এন্টারপ্রাইজ, নর্থ বেঙ্গল বাজার বিডি লিমিটেড, মেসার্স নুরে মুজেসসুম কর্পোরেশন, এনবিও সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড ও মেসার্স গরিবে নেওয়াজ এন্টারপ্রাইজ নামে কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে চাকরি দেয়ার নামে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করতেন। গ্রেপ্তারের সময় লালুর কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ৭৩টি ইসলামী ব্যাংক লি. এর ডেবিট কার্ড, নর্থ বেঙ্গল আউট সোর্সিং লিমিটেডের ইস্যু করা বিভিন্ন কর্মচারীর নামে ৯০টি আইডি কার্ড, একটি কম্পিউটার সিপিইউ, একটি প্রিন্টার, লালুর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে সাতটি ব্যাংকের চেক বই, দুটি পাসপোর্ট, নর্থ বেঙ্গল আউটসোর্সিং লিমিটেডের ফর্মে বিভিন্ন পদের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনপত্র ৮৪টি, লালুর নিজের তিনটি এটিএম কার্ড, এনবিজি এয়ার কার্গো লিমিটেডের প্যাডে আসামি আমিনুর ইসলাম লালু স্বাক্ষরিত পুলিশ তদন্ত রিপোর্টে অতিরিক্ত আইজিপি স্পেশাল ব্রাঞ্চ মালিবাগ, ঢাকা বরাবর পাঠানো ১১টি আবেদনপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে লালুর গ্রেপ্তারের খবরে শতাধিক ভুক্তভোগী সিআইডি অফিসের সামনে হাজির হন। তারা এ সময় সিআইডি কর্মকর্তাদের কাছে লালুর প্রতারণার বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। সোহেল রানা একজন ভুক্তভোগী বলেন, তিনি লালুর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চেকার পদে নিয়োগ পেতে সাড়ে ৭ লাখ টাকা দিয়েছেন। লালুর একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে যোগাযোগ করেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে গত ১৫ রমজানে টাকা লেনদেন হয়। টাকা নেয়ার লালু সমপরিমাণ টাকার একটি চেকও দেন। এরপর সংশ্লিষ্ট পদে যোগদানের জন্য নিয়োগপত্র দেয়া হয়। পরে যোগদানের জন্য প্রশিক্ষণের কথা বলে খিলক্ষেতের শ্যাওড়া এলাকায় একটি মেস বাসায় রাখা হয় চাকরি প্রার্থীদের। সেখানে প্রথম তিন থেকে চারদিন কোনোরকম ডাল-ভাত খাওয়ানো হলেও এরপর থেকে আর কোনো খাবার দেয়া হতো না। একপর্যায়ে ওই মেস ছেড়ে আশকোনা এলাকায় আরেকটি বাসায় উঠানো হয় চাকরিপ্রার্থীদের।

সিআইডি কর্মকর্তা জানান, লালু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এয়ার কার্গো বিভাগের বিভিন্ন পদে চাকরি দেয়ার নাম করে প্রায় দুই শতাধিক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে পার্থ পাল নামের একজন ভুক্তভোগীকে পিয়ন পদে চাকরি দেয়ার জন্য দুই লাখ টাকা নেন লালু। এছাড়া অজয় রায় ও অনুতম বর্মনের থেকে সুপার ভাইজার পদের জন্য দুই লাখ ১৫ হাজার, লোডার পদের জন্য পলাশ চন্দ্রের কাছ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার, প্রিয় রঞ্জনেরর কাছ থেকে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ পদের জন্য দুই লাখ ৫০ হাজার, নাঈম রানা ও পবিত্র পালের কাছ থেকে অ্যাসিসটেন্ট পদের জন্য দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন লালু। প্রতারণার শিকার পার্থ পাল দক্ষিণখান থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় লালুকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার লালুকে আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

 

সোহেল আরও জানান, লালুর ছোট ভাই শামীম চাকরি প্রার্থীদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। জুয়েল উদ্দিন নামের একজন বাসার একটি রুমে চাকরিপ্রার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতেন। এভাবে নিয়োগপত্র পাওয়ার প্রায় মাসখানেক পর চাকরিকে যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে লালু বলেন, তার ভাই টাকা পয়সা হাতিয়ে চলে গেছেন। তিনি বিষয়টি দেখছেন। চাকরি হবে বলে মিথ্যে আশ^াস দেন। একপর্যায়ে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারেন সোহেল।

তিনি আরও জানান, নিয়োগপত্র দেয়ার পর আশকোনার একটি বাসায় রাখা হয় চাকরিপ্রার্থীদের। ওই বাড়িতে ২৬টি রুম রয়েছে। কিন্তু টাকা নেয়ার পর থেকেই আর যোগাযোগ করেন নি লালু। খাবারদাবারও দেননি।

ঠাকগাঁওয়ের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান নামের আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, তিনি বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরির জন্য লালুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি পেতে লালুকে গত ২ মার্চ ৪ লাখ টাকা দেন। পরে নিয়োগপত্র দেন লালু। হজ¦ করেছেন। মিথ্যে কথা বলেন না এবং কোনো ছলচাতুরিও করেন না জানিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেয়া টাকার সমপরিমাণ অঙ্কের চেক দেন। এছাড়া নানা মিষ্টি কথা বলে চাকরিপ্রার্থীদের প্রলুদ্ধ করতেন।

মামলার বাদি পার্থ বলেন, তিনি অফিস সহকারী পদের লালুা সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই লালু বিভিন্ন কথাবার্তার একপর্যায়ে জানান, তাকে জামানত হিসেবে দুই লাখ টাকা দিতে হবে। যা তিন বছর পর ফেরত দেয়া হবে। পরে চাকরির প্রয়োজনে লালুকে টাকা দেই। এরপর আমাদের আশকোনার একটি বাসায় রাখা হয়। কিন্তু সেখানে খাওয়া-দাওয়া ও রুম ভাড়া দেয়া হতোনা। একপর্যায়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারি। এরপর মামলা করি।

Loading