২৬শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ১১:১৩
শিরোনাম:

নাসিম রিয়েল স্টেটের মালিক ইমাম হোসেন নাসিমের প্রতারণার গল্প সিনেমাকেও হার মানায়

নাসিম রিয়েল স্টেটের মালিক ইমাম হোসেন নাসিম। তার প্রতারণার প্রধান টার্গেট প্রবাসীরা। এর হাত থেকে রক্ষা পায়নি দেশে বসবাসকারীরাও। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও অফারের নামে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করে প্লট বিক্রির টাকা হাতিয়ে নিতো এ প্রতারক।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

প্রতারণার শিকার দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, জর্ডান, স্পেন, থাইল্যান্ড, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা।

র‍্যাবের জালে ধরা পড়ার পর নাসিমের সবই ভুয়া:

র‍্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর নাসিমের ধোকাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। স্বল্প মূল্যে রাজধানীতে প্রবাসীদের জমি দিচ্ছেন বলে দ্রুত বায়না করে নিতো। শুরু হতো প্রতি মাসে কিস্তি। এসব কিস্তির টাকা সরাসরি নিজ অফিসে নিতেন নাসিম। এক সময় প্রবাসীরা জানতে পারেন নাসিম একজন প্রতারক। তার কোনো জমি নেই সবটাই ভুয়া। সাভারের কাউন্দিয়ায় নদীর ওপারে সাইনবোর্ড দেখিয়ে যে প্লট বিক্রির কথা বলা হয়েছিলো সেটার ও কোনো অস্তিত্ব নেই।

গ্রেফতারের পর র‍্যাবের কাছে যা বলে নাসিম:

র‍্যাবের কাছে নাসিম দাবি করেছেন, তার কিছু জমি ছিলো। সেগুলো তিনি কিছু মানুষকে হস্তান্তর করেছেন। তবে তার স্বপক্ষে তিনি কোন ধরনের প্রমাণ দেখাতে পারেননি। জানা গেছে, ইমাম হোসেন নাসিম ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমা রূপনগর থানা পুলিশের হেফাজতে তিন দিনের রিমান্ডে নাসিম ও তার স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে আর কারা কারা এই প্রতারণায় যুক্ত তা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

র‍্যাবের এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, র‍্যাব-৪ এর পক্ষ থেকে দেয়া যোগাযোগের নম্বরে প্রায় ছয়শ’ প্রবাসী ফোন করেছেন। এর মধ্যে দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, জর্ডান, স্পেন, থাইল্যান্ড, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা রয়েছে।

প্রবাসীদের সঞ্চয় নাসিমের পকেটে: 

২০০৭ সাল থেকেই নাসিম বিভিন্ন মাধ্যমে প্রবাসীদের টার্গেট করে এবং তারাই বেশি ভুয়া প্লট কিনে। কয়েক বছর আগে নাসিম দুবাইয়ে রিহাবের একটি মেলায় স্টলও নিয়েছিল। সেখানে সে কয়েক শত কথিত প্লট বিক্রির চুক্তি করেন। সেই দুবাই প্রবাসীরা কয়েক বছর থেকেই টাকা পরিশোধ করছিল। একই পরিবারের ৫ থেকে ৭জন পর্যন্ত তার কাছে প্লট কেনার জন্য টাকা পরিশোধ করেছেন কিন্তু প্লট পাইনি কেউ।

র‍্যাবের কাছে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, নাসিম তাদের দ্রুত প্লট বুঝে দেবেন। বাড়ি তৈরি করলে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টাকাগুলো হাতিয়ে নেন। সে যে একজন প্রতারক সেটা বুঝতে পারেনি।

অস্ত্রধারী ভূমিদস্যু হিসেবে প্রতারণা:

আসামি অভিনব পন্থা অবলম্বন করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ জনগণের কাছে প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে বিভিন্ন সময় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে আবার ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শন পূর্বক জমি দখল করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে আসছিলো।

বকুল কুমার দাস নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ। অস্ত্র দেখে আমরা তার কাছে পাওনা টাকা চাইতে ভয় পেতাম। অপর এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, টাকা চাইতে গেলে তিনি গল্পের ছলে হুমকি দিতেন। মাঝে মাঝে অস্ত্র টেবিলের উপরে রাখতেন।

যতগুলো প্রতারণার অফিস গড়েন নাসিম:

নাসিম রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, নাসিম ডেভলপার লিমিটেড, নাসিম এগ্রো ফুড লিমিটেড, নাসিম বাজার, এস বি ফাউন্ডেশন, ডা. বেলায়েত হোসেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নাসিম পার্সেল ও কুরিয়ার সার্ভিস, সাপ্তাহিক ইমারত অর্থ, নাসিম শিপ বিল্ডার্স, নাসিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও কন্সাল্টেন্সি, নাসিম ট্রেডিং লিমিটেড, সাহানা আই হাসপাতাল,বাংলা নিউজ ১৬, নাসিম ড্রিংকিং ওয়াটার, নাসিম রিফাইন্ড সুগার, নাসিম বেভারেজ।

আত্মগোপনের কৌশল:

বিভিন্ন সময়ে নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করে সে সেসব প্রতারণার শিকার মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতো। সময়ে সময়ে অস্ত্র প্রদর্শন ও ওয়াকিটকি দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতো। গ্রেফতার এড়াতে আন্ডারগ্রাইন্ডে তার গোপন সুরঙ্গে অবস্থিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্বলিত দরজাযুক্ত অফিসে আত্মগোপন করতো। নাসিমের অনুপস্থিতিতে তার তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার প্রতারণার ব্যবসা দেখাশোনা করতো।

এদিকে শাহআলী থানা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, নাসিম মূলত যে অস্ত্রটি ব্যবহার করতেন তার কোনো কাগজপত্র ছিলো না। পুলিশের কাছে কোন ধরনের কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

নাসিমকে গ্রেফতারে পুলিশ ছিলো নিরব:

নাসিমের কাছে প্লট কিনতে গিয়ে প্রতারণার বিভিন্ন সময়ে শাহআলী থানা ও কোর্টে নাসিমের বিরুদ্ধে ৫৫টি মামলার ওয়ারেন্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

একের অধিক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, নাসিমের বিরুদ্ধে শাহআলী থানায় বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয়া হলেও তারা তা আমলে নেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অস্বীকার করে শাহআলী থানার ওসি এবিএম আসাদুজ্জামান বলেন, যারা এসেছিলো তারা জিডি করতে এসেছিলো। মামলা করতে না। তাদের খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধার করে দিতে বলেন। কিন্তু টাকা উদ্ধার করে দেয়াতো পুলিশের কাজ নয়।

র‍্যাব-৪ এর সিও অতিরিক্ত ডিআইজি মোজ্জাম্মেল হক বলেন, নাসিম বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছে। প্রতারণার সঙ্গে অফিসের কর্মীরাসহ আর কারা কারা জড়িত তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে তার পরিবারের সদস্যদেরও ডাকা হতে পারে।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৬শ’ প্রবাসী ফোনে অভিযোগ করেছেন। এছাড়াও সরাসরি শতাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ জমা পড়েছে।

Loading