ভুয়া মানি অর্ডারের মাধ্যমে ডাক বিভাগের সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূল হোতা ফজলুল হকসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। ডাক বিভাগের তিন কর্মচারীর যোগসাজসে প্রতারণা করতো চক্রটি।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!র্যাব জানিয়েছে, মূলত ২০১৮ সালের ‘এ্যারোলাইট বায়োগ্যাস’ নামের একটি সংগঠন খুলে কৃষকদের জন্য জৈব সার পাঠাতেন ফজলুল হক। এজন্য তিনি ডাক বিভাগের ভিপি সার্ভিস ব্যবহার করতেন। কৃষকদের কাছে পাঠানো সারের সুযোগে তিনি অতিরিক্ত নকল মানি অর্ডার পাঠাতেন ডাক অফিসে। এভাবেই শুরু হয় তার অভিনব প্রতারণা। দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে বলে জানিয়েছে র্যাব।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ফজলুল হক আশরাফ (৫২) ও তার স্ত্রী আসমা আক্তার শিমু (৩৮), পোস্টাল অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মো. মোস্তাফিজুর রহমান (৫২), ডলি রানী সাহা (৫৩), মো. আমজাদ আলী (৫৫), ও লিংকন সাহা (২৪)। তবে এ ঘটনায় এখনও পলাতক রয়েছেন মো. বশির হোসেন ও আবুল বাশার নামের দুজন। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে নগদ দেড় লাখ টাকা, জিপিওর বিপুল পরিমাণ সিল এবং মানি অর্ডারের ফরম উদ্ধার করা হযেছে।
রোববার সন্ধ্যায় র্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, রোববার ভোরে গোপন তথ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকা থেকে ফজুলল ও তার স্ত্রী আছমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা পোস্টাল জালিয়াতি ছাড়াও এই দীর্ঘদিন ধরে নানান প্রতারণা করছিলেন। গ্রেপ্তার দম্পতির দেওয়া তথ্যে বিকেলে ডাক বিভাগের আমজাদ, মোস্তাফিজুর ও ডলি রাণী এবং তাদের সহযোগী সিভিলিয়ান লিংকনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা জিপিও’র উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, একটি প্রতারক চক্র পোস্টাল মানি অর্ডার জাল করে অভিনব উপায়ে টাকা উত্তোলন করছে। গত জুন-জুলাইয়ের দিকে কয়েক হাজার জাল মানি অর্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়। শুধুমাত্র ঢাকা জিপিওতে এই রকম ৮ হাজার জাল মানি অর্ডারের পাওয়া যায়। এছাড়া, মিরপুর ও নিউমার্কেট পোস্ট অফিসেও এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক জাল মানি অর্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়। সন্দেহভাজন প্রতারক হিসেবে জিপিও কর্তৃক ফজলুল, আবুল বাশার এবং শিমু বেগমের নামে মামলা হয়। এরপর আসামিরা আত্মগোপনে চলে যান। পরে এই বিষয়ে র্যাবের কাছে সহায়তা চেয়ে অভিযোগ করে জিপিও কর্তৃপক্ষ। এরই প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে প্রতারণা চক্রের মূলহোতাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আশিক বিল্লাহ বলেন, ফজলুল হক ২০১৮ সালে প্রথমে পোস্টাল সার্ভিসের কতিপয় কর্মচারীর সহায়তায় মানি অর্ডারের টাকার পরিমাণ পরিবর্তন করে জালিয়াতি শুরু করে। তিনি নিজেকে পথশিশু ফাউন্ডেশন, সানোয়ার ফাউন্ডেশন এবং এ্যারোইট বায়োগ্যাস নামক কতিপয় সংগঠনের প্রধান বলে দাবি করতেন।
লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, তিনি পথশিশুদের উন্নয়নের জন্য তাদের দিয়ে কাগজের ঠোঙ্গা বানিয়ে বিক্রি করে থাকেন। স্বল্পমূল্যে এই কাগজের অব্যাহত সরবরাহের জন্য তিনি প্রথমত সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি দেন। পরে হাইকোর্টে এক রিটের মাধ্যমে সমস্ত শিক্ষাবোর্ড থেকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রতিটি খাতা ৬০ পয়সা মূল্যে ক্রয় করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। সে অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষকদের কাছ থেকে ৬০০ টাকার বিনিময়ে ১ হাজার খাতা কেনা শুরু করেন।
প্রতারক ফজলুল অধিক পরিমাণের মানি অর্ডারগুলো সরকারি খামের মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট মাস্টার বরাবর পাঠাতেন। বেশ কিছুদিন আগে তিনি গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী পোস্ট অফিস থেকে প্রায় ৪৫০ চিঠি বিভিন্ন পোস্ট মাস্টার বরাবর পাটান। খামের ভেতরে বিভিন্ন অংকের জাল মানি অর্ডার ছিল। প্রতিটা খামে প্রেরকের জায়গায় তিনি নাগরী পোস্ট মাস্টারের সিল ব্যবহার করেন। পরে নরসিংদী পোস্ট মাস্টারের কাছে পাঠানো খামটি পৌঁছালে তিনি খামগুলো ও মানি অর্ডার দেখে সন্দেহ করেন। কারণ মানি অর্ডার ফরম সাধারণত খামে পাঠানো হয়না। তখন তিনি তার সন্দেহের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানালে তারা তদন্ত করে জানতে পারেন, মানি অর্ডারগুলো জাল। এছাড়াও কৃষকদের সৌদি খেজুর গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রলোভন দেখান ফজলুল। এর অংশ হিসেবে তিনি রেজিষ্ট্রেশন ফি বাবদ ১০০ টাকা ধার্য করে বিকাশের মাধ্যমে গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠান পথশিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পোস্টাল অর্ডারের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করেন।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, তখন থেকেই তিনি জিপিওর মানি অর্ডার ফরম জাল করে ৬০০ টাকা মূল্যের মানি অর্ডার বিভিন্ন শিক্ষকদের নামে পাঠাতে শুরু করেন। আসল মানি অর্ডারের মতো সই এবং সিল সম্বলিত নকল মানি অর্ডারগুলো কৌশলে জিপিওসহ বিভিন্ন পোস্ট অফিসে বিতরণ চ্যানেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও তিনি এ্যারোলাইট বায়োগ্যাস প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ই-কমার্সের ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’র আদলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকদের কাছে তথাকথিত জৈব সার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সার পাঠানোর এই প্রক্রিয়াতে তিনি পোস্টাল সার্ভিসের ভিপি (ভ্যাল্যু পেয়েবল) ব্যবস্থা ব্যবহার করেন। পরে তিনি জৈব সারের ভুয়া বিক্রি দেখিয়ে তার এ্যারোলাইট বায়োগ্যাসের নামে একই পদ্ধতিতে জাল মানি অর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। এ প্রক্রিয়ায় তিনি নিজেই মানি অর্ডারের প্রাপক।
![]()