‘সাহিনুদ্দিনের হাত-পা কাইট্যা ফেলাইতে পারবি তোরা? থানা-পুলিশ-মামলা যা হয় আমি বুঝবো’ – এমন আদেশ পেয়েই চার ভাড়াটে খুনি নিয়ে গত ১৬ মে বিকেলে রাজধানীর পল্লবীতে ছেলের সামনে ব্যবসায়ী সাহিনুদ্দিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন লক্ষ্মীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) এম এ আউয়াল। হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুমন ব্যাপারী পুলিশি রিমান্ডে এ এ তথ্য জানিয়েছেন।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!গত সোমবার পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে চাঞ্চল্যকর হত্যার দায় স্বীকার করেন মিরপুরের কিশোর গ্যাং সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন ব্যাপারী।
এ হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সুমনের সহযোগী মানিক ও মনিরকে সরাসরি সাহিনুদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপাতে দেখা যায়। ওই দুইজন ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। মামলায় ১ নম্বর আসামি এমএ আউয়ালকে গত ২০ মে ভৈরবের একটি মাজার থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। আর সুমনকে রায়েরবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডে খুনের সব পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন সুমন। এ মামলায় আরো দুই জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সুমনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ২০১৪ সালে রাজনীতিতে পা রাখেন সুমন। ২০১৭ সালে সাবেক এমপি আউয়ালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আউয়ালের আবাসন ব্যবসা হ্যাভেলি প্রোপার্টিজের সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ পান সুমন। মূলত আউয়ালের জবরদখলে থাকা সম্পত্তির দেখভালে লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করতেন সুমন। গত বছরের ডিসেম্বরে সাহিনুদ্দিনকে দিয়ে প্রজেক্টের ২০ কাঠা জমিতে বাউন্ডারি দেন ব্যবসায়ী মোস্তফা। পরে আউয়ালের হয়ে সুমনসহ কয়েকজন মিলে ওই বাউন্ডারিটি ভেঙে ফেলেন। এর জের ধরে আউয়ালের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাঁধে সাহিনুদ্দিনের।
রিমান্ডে সুমন আরো বলেন, আউয়াল স্যারকে বলেছিলাম কী করা লাগবে স্যার, শুধু বলেন। আউয়াল তাদের বলেন, সাহিনুদ্দিনের হা-পা কাইট্যা ফেলাইতে পারবি তোরা? সুমন বলে- পারবো স্যার। তখন আউয়াল বলে, ঠিক আছে। তাহের, সজিব, সাইড ম্যানেজার কিবরিয়া যা বলবে ওইভাবে করবি। থানা পুলিশ মামলা যা হয়, আমি বুঝবো। ঠিক আছে বলে সুমন ও টিটুসহ সকলেই মিটিং থেকে বের হয়ে হামলার পরিকল্পনা করার জন্য তাহেরের কার্যালয়ে যায়। এই মিটিংয়ে আউয়াল ছিলেন না। তাহেরের কক্ষেই সাহিনুদ্দিনের হাত-পা কাটার পরিকল্পনা হয়। মওকা খুঁজতে থাকে তারা। এর দুই দিন পর সাহিনুদ্দিন ফের আউয়ালের একটি পিলার ভেঙে ফেলায় সাবেক ওই এমপি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে সাহিনুদ্দিন ও তার ভাই মাইনুদ্দিনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় মামলা ঠুকে দেয়। ওই মামলায় সাক্ষী বানানো হয় কিলার সুমন ও টিটুকে। সেই মামলায় পল্লবী থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো নিহত সাহিনুদ্দিন ও মাইনুদ্দিনকে। তারা জেলে থাকা অবস্থাতেই সাহিনুদ্দিনের সমন্ধি আউয়ালের কাছ থেকে সাবেক মেজর মোস্তফা কামালের বাউন্ডারি ভাঙার চুক্তি নিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন। সাহিনুদ্দিনের সমন্ধিও আউয়ালের কোম্পানিতে কাজ করতেন। এর ২৫ দিন পর দুই ভাই জেল থেকে বের হয়ে আউয়ালের ১০ কাঠা জমির বাউন্ডারি ভেঙে ফেললে সুমন ও টিটুকে তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে সজিব, তাহের ও কিবরিয়া।
এ সময় আউয়াল পকেট থেকে ২০ হাজার টাকা বের করে সুমনকে দিয়ে বলেন, এটা রাখ, পোলাপানের খরচ। সাহিনুদ্দিনকে মারার জন্য এটা দিলাম। কাজ শেষে তোকে দেড়-দুই লাখ টাকা দিয়ে খুশি করে দেবো। কাজ কইরা ফেল, ভয় পাইস না, আমি আছি। কাজটা করার জন্য স্যার কয়েকবার বলেছে, ৪ জন খুনি ভাড়া করা হয়। ঘটনার দিন রকি ৪ জন ভাড়াটে খুনি (শরীফ, ইমন, তুহিন, অন্য জন সুমনের অপরিচিত) নিয়ে পল্লবীর ৩১ নম্বর লাইনে আসে। রকি চারজন কিলারকে অগ্রিম দিতে সুমনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা চায়। এ সময় টিটু ছিলো। এ সময় সকলেই সাহিনুদ্দিনের ওপর কে কিভাবে হামলা করবে তার ছক কষে।
১৬ মে আনুমানিক বিকাল ৪টার দিকে টিটুর কথামতো সাহিনুদ্দিকে ফোন দিয়ে সুমন বলেন, আউয়াল স্যার ইটির টাকা দেবে; টাকা নিতে ৪০ নম্বর বাসার সামনে সাহিনুদ্দিনকে আসতে বলেন। রাজি হয় সাহিনুদ্দিন; এটাই কাল হয় তার জন্য। আধা ঘণ্টা পর সাহিনুদ্দিন তার ৬ বছরের ছেলে মাশরাফিকে নিয়ে বাইকে করে বাসার নিচে এসে ফোন দেয় সুমনকে। টিটু তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলো। সুমন ওই বাসা থেকে নিচে নেমে এসে মাশরাফিকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে হাতে ১০ টাকা দিয়ে চিপস কিনে খাওয়ার জন্য বলেন। সুমন বলেন, সাহিন ভাই, স্যার ২০ হাজার টাকা দিছে। সাহিনুদ্দিনের হাতে দেয়ার আগে টাকাগুলো গোনার ভান করে সময়ক্ষেপণ করছিলেন সুমন। এ সময় মুরাদ অতর্কিত এসে চাপাতি দিয়ে সাহিনুদ্দিনের ডান হাতে কোপ বসিয়ে দেয়। মানিক চাপাতি দিয়ে তার ডান পায়ে কোপ দেয়। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে সাহিনুদ্দিন রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে বাসার ভেতরে ঢুকে যায়। ভাড়াটে ৪ কিলারও দৌড়ে পেছন পেছন গিয়ে বাসার গ্যারেজে ঢুকে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে সাহিনুদ্দিনের মাথা, ঘাড়, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপায়। হামলার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখছিলেন সুমন। একপর্যায়ে সাহিনুদ্দিন দৌড়ে বাসার সামনে গেলে সেখানেও মানিক ও মুরাদ কোপাতে থাকে। হঠাৎ মনির এসে পড়ে থাকা চাপাতি দিয়ে সাহিনুদ্দিনের মাথায় এলোপাতাড়ি ১০টি কোপ দিয়ে মাথা অর্ধ খণ্ড করে ফেলে। এরপর সবাই মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ১৫ মিনিট পরে সুমন জানতে পারে সাহিনুদ্দিন মারা গেছে। এ সময় সাবেক এমপি আউয়ালকে ফোন করে সুমন বলেন, ‘স্যার, সাহিনুদ্দিকে শেষ করে দিছি।’ সঙ্গে সঙ্গে আউয়াল লাইন কেটে দিলে আত্মগোপনে চলে যায় সুমন। পরে টিটু ফোন করে বলে, ‘কিরে, কি হয়েছে? সুমন বলেন সাহিনুদ্দিন শেষ।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. আহসান খান বলেন, চাঞ্চল্যকর সাহিনুদ্দিন হত্যার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনায় জড়িত বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
![]()