৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১১:৫৭
শিরোনাম:

নিউক্যাসেলে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ লর্ড মেয়র বাংলাদেশি হাবিব রহমান, ব্রিটেনের ৮০০ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন বাংলাদেশি হাবিব রহমান

নাজমা সুলতানা নীলাঃ ব্রিটেনে নতুন এক ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হাবিব রহমান। ৮০০ বছরের ইতিহাসে নিউক্যাসল আপন টাইন শহরে প্রথম কোনো অশ্বেতাঙ্গ বাংলাদেশি মুসলিম লর্ড মেয়র পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

গত বুধবার ২৬শে মে ২০২১ এ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি। এ সময় বক্তব্যে তিনি পিতা-মাতার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষের জন্য সমান কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হাবিব রহমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। বিবিসিসহ মূলধারার গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব সহকারে হাবিব এর এই অর্জনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

হাবিব রহমান মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৮৫ সালে মা ভাইদের সঙ্গে বাংলাদেশ ছেড়ে ব্রিটেনের নিউক্যাসল আপন টাইন শহরে চলে যান। তখন তিনি ইংরেজি বলতেই পারতেন না। তিনি ২০১০ সাল থেকে এলসউইক ওয়ার্ডের নিয়মিত নির্বাচিত কাউন্সিলর। ২০২১ সালে তিনি নিউক্যাসল সিটির এক নাম্বার নাগরিক লর্ড মেয়র পদে ডেভিড কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি বিরোধী লেবার দলের সদস্য। হাবিব ২০১৯ থেকে দুই বছর সিটির শেরিফ এবং ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরই তিনি গভীর আবেগঘন বক্তব্য রেখেছেন। এ সময়ে তাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য তার মা ও ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন এবং সরাসরি তার প্রয়াত পিতা আজিজুর রহমান (মনুদর্জি নামে সুপরিচিত) কে নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য রেখেছেন।

পিতার বাসস্থান ও কর্মস্থল লন্ডন শহরেই ছিলো। তার একভাই নিউক্যাসল আপন টাইন শহরে থাকেন। দুই ভাই একসাথে থাকার ইচ্ছায় নিজ ব্যবসা শুরু করে ১৯৭৭ সালের মে মাসের প্রথমার্ধে লন্ডন ছেড়ে নিউক্যাসল শহরে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে যান। তার কর্মস্থল ছিলো সিটি সংলগ্ন ওয়ালজেন এলাকাতে। নতুন শহরে মাত্র ১০দিন অবস্থানের পর নিজ ব্যবসাস্থলেই, ১৯৭৭ সনের ১৯ মে কোনকিছু বুঝে উঠার পূর্বেই একজন শ্বেতাঙ্গ আক্রমনকারী ঘাতকের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ঘটনাস্থলেই শেষ নিশ্বাস ছেড়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে শহীদ হন। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’।

আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয়ার সময় হাবিব রহমান তার সহকর্মীদের বলেছেন, নিউক্যাসেলে তার শৈশবের দিনগুলো বাধাগ্রস্ত হয়েছিল নিষ্ঠুর বর্ণবাদে। একজন এশিয়ান মুসলিম হিসেবে এই শহরে তার যে অভিজ্ঞতা তা থেকে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নেন, বৈষম্যকে একদিন পরাজিত করবেন।

বর্তমানে হাবিব রহমানের বয়স ৪৭ বছর। নিজের নিয়োগ নিয়ে তিনি বলেছেন, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তগুলোর একটি। এ সময়ে তিনি তার দায়িত্বকে ব্যবহার করে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সমতাকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিন সন্তানের পিতা হাবিব বলেন, এভাবেই ইতিহাস নির্মিত হয়। এই ইতিহাস আরো আগে হওয়া উচিত ছিল উল্লেখ করে বলেন দায়িত্ব নিয়ে এই শহরকে সব ধর্ম, বর্ণ, জাতি এবং লিঙ্গের মানুষদের জন্য অবাধ ও উন্মুক্ত করণ নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

আমি ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ এবং যেকোনো রকম বর্ণবাদকে নিন্দা জানাই। ১২১৬ সালের পর থেকে মেয়র পেয়েছেন নিউক্যাসলবাসী। কিন্তু ১৯০৬ সালের আগে সেখানে লর্ড মেয়রের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ওই সময় ষষ্ঠ কিং এডওয়ার্ড একটি ডিক্রি জারি করে এই পদ সৃষ্টি করেন।

কেন দায়িত্ব গ্রহণের বক্তব্যে সরাসরি নিজের পিতাকে নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন? সাংবদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিব রহমান বলেছেন, আমি বলতে চেয়েছি যে, তাকে আমরা সবাই খুব মিস করছি। তার কাছে আমরা এই বার্তা দিতে চাই যে, তিনি ১৯৭৭ সালে যে বর্ণবাদী শহর দেখেছিলেন, নিউক্যাসেল এখন আর তেমন নেই। এখন এ শহর অনেক নিরাপদ ও সহিষ্ণু। এই ধারা গড়ে তুলেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি। সম্ভবত তার অনেকটা শুরু হয়েছে আমার পিতার মৃত্যুর পর। আমি আমার পিতাকে বলতে চাই যে, আমাদেরকে নিয়ে তার এখন ভীত হওয়ার কিছু নেই। তিনি যখন এই শহর ছেড়ে গেছেন, এই শহর এখন তার চেয়ে অনেক উন্নত।

বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপ শো রেসিজম দ্য রেড কার্ড (এসআরটিআরসি) এবং ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হাবিব রহমান। বুধবার তার দায়িত্ব গ্রহণের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের সাবেক তারকা ও এসআরটিআরসির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জন বেরেসফোর্ড। জন বলেছেন, ১৯৯৮ সাল থেকে এসআরটিআরসির একজন ব্যতিক্রমী সমর্থন হাবিব রহমান। ব্রিটেনে বর্ণবাদ বিরোধী শিক্ষা বিষয়ক দাতব্য সংস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। নিউক্যাসেলের লর্ড মেয়র হিসেবে তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। তাকে পাশে রেখে আমরা অর্থসংগ্রহের নতুন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেবো।

এসআরটিআরসির প্রেসিডেন্ট শাকা হিসলোপ বলেছেন, হাবিব রহমানের রাজনীতিতে উত্থান দেখে বাস্তবেই গর্ব বোধ হচ্ছে। যারা খুব অভাবী তাদের সমর্থনে হাবিব সমসময়ই এগিয়ে গেছেন। শো রেসিজম দ্য রেড কার্ড উদ্যোগে কাজের মাধ্যমে আমি হাবিবকে চিনতে পেরেছি। আর সেই সুবাদে এই ইতিহাস রচনা হতে দেখছি। এই শহরের প্রতি আমাদের সবার ভালবাসা আছে। সম্মান আছে।

লেবার দলের কাউন্সিলর ইরিম আলি নিউক্যাসল নিয়ে অসীম শ্রদ্ধা ও আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে লর্ড মেয়র হিসেবে হাবিব রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। শহরের লেবার নেতা এবং কাউন্সিলর নিক ফোরবিস বলেছেন, হাবিব রহমানকে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে নিউক্যাসেল এবং আমাদের মূল্যবোধের বিষয়ে শক্তিশালী বার্তা দেয়া হয়েছে। প্রচলিত মেয়রাল চেইনে (সারিতে) এখন আমরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের একত্রিত করছি। আমরা তাদেরকে বন্ধুত্বের এবং গর্বের বন্ধনে একত্রিত করেছি।

Loading