বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ও তার স্বামীকে হেনস্থা ও মারধরের অভিযোগ তুলে রাতের আঁধারে গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। এসময় তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় এক জনপ্রতিনিধি ও যুবলীগের এক কর্মীর বসতবাড়ি এবং একটি পাঠাঘারে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। হামলায় নব্বই ঊর্ধ্ব এক বৃদ্ধ ও তার স্ত্রীকে মারধরেরও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকাজুড়ে এই ঘটনা ঘটে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং আক্রান্ত গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে রাতের আধারে গ্রামে ঢুকে বাসাবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা আড়াল করতে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তাদের সহপাঠী ও স্বজনকে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। পরে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে দোষীদের গ্রেপ্তার না করা হলে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে অবরোধ তুলে নেয়।
অন্যদিকে রাতের আঁধারে গ্রামের ঢুকে ছাত্র-ছাত্রীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং হামলার ঘটনার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও গ্রামবাসী।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় চরআইচা গ্রামের আবুল কালাম হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দা জানায়, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চরআইচা গ্রামের রাস্তা দিয়ে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর ছেলেটি মেয়েটিকে মারধর শুরু করে।
এসময় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বরিশাল-ভোলা সড়কের একটি দোকানে অবস্থানরত বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ও একই এলাকার ইউপি সদস্য সাইদুল আলম লিটনসহ অন্যান্য লোকজনকে ডাকা হলে তারা এসে ছেলে ও মেয়েটির পরিচয় এবং মারধরের কারণ জানতে চায়। তারা ঘটনার বিষয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন জানিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে গ্রামের রাস্তা থেকে মূল সড়কে চলে যায়।
সড়কে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি (স্ত্রী পরিচয়ধানকারী) ছেলেটিকে (স্বামী পরিচয়ধানকারী) কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পর শুরু করে এবং মোবাইল ফোনে মেয়েটির সহপাঠীদের খবর দেয়।
ইউপি সদস্য লিটনের ভাই ফারুক হোসেন জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ করেই চরআইচা গ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ’ শিক্ষার্থী লাঠিসোটা নিয়ে ঢুকে পড়ে। তারা স্থানীয় শেখ রাসেল ক্লাব ও সুকান্ত আব্দুল্লাহ পাঠাগার, লিটন মেম্বার ও স্থানীয় যুবক জয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
স্থানীয় যুবক জয়ের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়
তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে হামলা চালাতে আসছে এমন খবরে দরজায় তালা দিয়ে আমি বাইরে যাই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। এরপর ঘরের ভেতরে থাকা ফার্নিচার, টেলিভিশনসহ সবকিছু ভেঙে ফেলে এবং ঘরের ভেতরে লুটপাট চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও টাকা পয়সা নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্থানীয় ইউপি সদস্য লিটনের অনুসারী জাহিদ হোসেন জয় নামের এক যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রায়ই উত্ত্যক্ত করেন। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক ছাত্রী তার স্বামীকে নিয়ে পাশের আনন্দ বাজার এলাকায় ঘুরতে গেলে তাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালায় জয় ও তার সহযোগীরা এবং ইউপি সদস্য লিটনের উপস্থিতিতে ওই ছাত্রী ও তার স্বামীকে মারধর করা হয়। এসময় ওই ছাত্রী নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সঙ্গে থাকা ব্যক্তি তার স্বামী বলে পরিচয় দিলেও বখাটেরা নানানভাবে হেনস্থাও করে তাদের।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী জানান, বেশ কয়েকজন লোক যখন ওই ছাত্রী ও তার স্বামীকে হেনস্থা এবং মারধর করছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে আমরা সেখানে যাই এবং ওই ছাত্রীর পক্ষে অবস্থান নেই। এসময় মেম্বর লিটন ও জয় আমাদের ওপর চড়াও হয়, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা চলে আসলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এরপর গোটা বিষয়টি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মেম্বর লিটন ও জয়ের গ্রেপ্তার দাবিতে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে। যদিও কিছু সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম ইয়ামিন।
শিক্ষার্থী সোহেল জানান, শিক্ষক ও পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে আমরা (শিক্ষার্থী) সড়ক অবরোধ তুলে নিলেও ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছি। আল্টিমেটাম অনুযায়ী আজ বুধবার সকাল ১০টার মধ্যে লিটন মেম্বর ও জয়কে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনা হলে নতুন করে আন্দোলনের পথ বেছে নিবে শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, হামলায় আহত মেম্বর লিটনের পিতা আলতাফ হোসেন হাওলাদার বলেন, আমি হাটতে চলতে পারি না। দুই-তিনশো ছেলে এসে আমার ঘর ভাঙচুর করেছে। আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মারধর করেছে।
জাহিদ হোসেন জয়ের মা জোছনা বেগম বলেন, আমার ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। তারপরও এসে আমার ঘর বাড়ি ভেঙে লুটপাট করে নিয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর আগেও আমার বাড়িতে হামলা করেছে তারা। এখন আবার এসে লুটপাট করে গেছে। আমরা এলাকাবাসী জিম্মি হয়ে আছি ছাত্রদের কাছে। তবে ইউপি সদস্য সাইদুল আলম লিটনের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. খোরশেদ আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের সকল দাবি আমরা শুনেছি। প্রশাসন কাজ করছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের মামলা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনা আমরা জেনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
![]()