২৭শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ১১:৪৬
শিরোনাম:

মোঃ অসীম চৌধুরী : পশ্চাৎমুখী কর্মকাণ্ড রুখে; উন্নত বাংলাদেশ গড়ি এই হোক আজকের অঙ্গীকার!

মোঃ অসীম চৌধুরী, ডেস্ক রির্পোটঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে মহান বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ নট সিন দ্য হিমালয়াস। বাট আই হ্যাভ সিন শেখ মুজিব। ইন পারসোনালিটি অ্যান্ড ইন কারেজ, দিস ম্যান ইস দ্য হিমালয়াস। আই হ্যাভ দাজ হ্যাড দি এক্সপেরিয়েন্স অব উইটনেসিং দ্য হিমালয়াস।’

আজ মার্চের শেষ দিন, এই মাস বাঙালির স্বপ্নসাধ যৌক্তিক পরিণতির এক মাস। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ, আবেগ-অনুভূতি বিজড়িত মাস এই মার্চ। এই মার্চে ৪টি দিবস খুবই গুরুত্ব বহণ করে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিবস, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা। এ মাসের ২৬ তারিখে এ দেশের জন্ম।

আবার ১৭ তারিখে জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই মার্চ বাঙ্গালি জাতির জন্য অর্থবহ এক মাস। এ মাসেই তার জাদুকরি ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন তিনি। গর্জে উঠেছিল বাঙ্গালী।

স্বাধীনতার প্রেরণার উৎস ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐ ভাষণ। ঐতিহাসিক এই ভাষণের পর প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গহীনে লালন করা তখনো অধরা ‘স্বাধীনতা’ যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু একই বৃন্তে দুই ফুল। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে মরণপণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জাতি। অত্যাচার-নিপীড়নে জর্জরিত বাঙালি জাতির সামনে আলোকময় ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দেন বঙ্গবন্ধু।

তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। স্বাধীনতার ইতিহাস ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ২ লাখ মা-বোনের ত্যাগের ইতিহাস। স্বাধীনতা মানে কোটি বাঙালির আত্মনিবেদন ও সংগ্রামের গৌরবগাঁথা। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের মার্চের এই দিন।

গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালি সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। শুরু হয় সর্বাত্মক এক জনযুদ্ধ। ২৬৬টি মহার্ঘ্য দিনের সেই জনযুদ্ধের সফল পরিণতিতে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় নতুন এক রাষ্ট্র। আমরা পাই, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে উপমহাদেশের জনগণ পায় পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি ভূখণ্ড রাষ্ট্র।

এরপর শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের নতুন করে শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখার ষড়যন্ত্র। খুব বেশিদিনের ইতিহাস নয়। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলার মানুষের ভোটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার আড়ালে সময় ক্ষেপণ করে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে তারা। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যা রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ইয়াহিয়া খান সমস্যা সমাধানের জন্য সামরিক ব্যবস্থা বেছে নেন আর এখানেই পাকিস্তানের সমাপ্তি হলো।’ বঙ্গবন্ধু যে কোনো মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্য রাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ভবন) থেকে বঙ্গবন্ধু ইপিআর-এর ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ডাক দেন।

বলেন,‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ তোমরা যে যেখানেই আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’

কে না জানে, এর আগে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা দিয়ে গোটা জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন।

সেই থেকে শুরু।

পাকিস্তানিদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সচেতন নাগরিককে নির্মূল করা। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সর্বস্তরের জনগণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যা, ধ্বংস ও পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ে দীপ্ত বাঙালির সামনে তখন কোনো মারণাস্ত্রই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বাঙালি হয়ে ওঠে সংগ্রাম-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা

অর্জনকারীদের প্রতীক। এরপর ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

আজ মুজিব শতবর্ষের শেষ দিন ; স্বাধীনতার এতোটা বছর পরেও মহান ক্ষণজন্মা মহৎপ্রাণ বঙ্গবন্ধুকে কতটা ধারন করেছি তা ভাববার অবকাশ আছে।

বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, জাতির গর্বিত পরিচয়। স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু তাই একই বৃন্তে দুই ফুল। বাংলার প্রজন্মের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন বঙ্গবন্ধু।

প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়। তরুণ প্রজন্মের উচিত লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে দেশবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

যারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করে পরবর্তী প্রজন্মকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সচেষ্ট, তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, দোসর ও তাদের নব প্রজন্মের আস্ফালন রুখে দিতে হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, পশ্চাৎমুখী যে কোনো কর্মকাণ্ড রুখে দিতে হবে। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কাজে এই অঙ্গীকারে কোনো দোদুল্যমানতা কাম্য নয়।