১৯শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১১:৩৯
শিরোনাম:

২৮ জুলাই পল্টনের জনসভায় বিএনপির ভিতর নেতৃত্বের কোন্দল আরও প্রকাশ্যে এসেছে

সুভাষ দাশগুপ্ত : ১০ই ডিসেম্বর ২০২২ সাল, বিএনপি যখন তাদের জনসভার স্হান পরিবর্তন করে পল্টন থেকে গোলাপবাগ মাঠে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়, তখনই তাদের সরকার পতনের সেই মহাসমাবেশ ব্যর্থতায় পর্যুষিত হয়। তখন আমি লিখেছিলাম যে বিএনপির রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটেছে। পরবর্তীতে, এক দফার পরিবর্তে পর পর আসতে লাগল ২৭ দফা, ১০ দফা এবং সর্বশেষ ৩১ দফা। দফার পর দফা দিয়ে ও আর এগোনো যায়নি।

এর মধ্যে আসে, বাংলাদেশের জন্য মার্কিন ভিসা নীতি।বিএনপি আবার নতুন করে জেগে ওঠে এবং ২৭, ১০ এবং ৩১ দফা দাবী থেকে সরে আসে। নতুন করে শুরু হয় আবার এক দফা দাবী- আগে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, তারপর আলোচনা। তাদের দাবী শুনে মনে হয় এ দেশে কোন সরকার নেই, দেশটা যেন এনজিওই চালায়। বিএনপির এক দফার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১৩ সাল থেকে যা এখনও চলছে। এরই মধ্যে দুবার জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেলো।

২০১৪ সালে নেতৃত্ব সংকট এবং নিশ্চিত পরাজয় অনুমান করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেই নি। এই পরিস্হিতিতে ১৫৪ জন কেন, ৩০০ প্রার্থীই তো বিনা ভোটে জেতার সম্ভাবনা ছিল। দ্বি-দলীয় সিস্টেমে, এক দল যদি নির্বাচনে না আসে তখন ভোটের ফলাফল যে রকম হতে বাধ্য সে রকমই হয়েছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে। ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই নির্বাচনে বিএনপি সম্মুখীন হয় অন্য ধরনের সমস্যায়। কি সমস্যা- সাথে সাথে শুরু হয় মনোনয়ন বাণিজ্য। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে আনেন সেই নির্বাচনে বিএনপির দুজন সিনিয়র নেতাকে নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের ঘটনা।বাণিজ্যের কারণেই স্হানীয় পর্যায়ে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।

মনোনয়ন বন্চিতরা মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান করে।এক এলাকায় দেখা যায়, কোন ভোট কেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্ট নেয়। ভোট শুরু হবার কিছুক্ষণ পরেই ওই এলাকার বিএনপির প্রার্থী সাথে সাথে প্রেস ব্রিফিং করে জানিয়ে দিলেন যে আওয়ামী লীগের কর্মীরা তার এজেন্টদের সব কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। পরবর্তীতে জানা গেল, এলাকায় ৩৫ জন পোলিং এজেন্ট ঠিক করার জন্য এক নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এবং প্রতিজনের জন্য ৩০০০ টাকা হিসেবে তার হাতে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়।

ঐই লোক কোন পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করেনি এবং সব টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেয়। কিন্তু সব দোষ নন্দ ঘোষের – আওয়ামী লীগের। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে দেয়া হয়নি। দিনের ভোট দিনেই হয়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের কোন্দলে বিএনপির এক পক্ষের ভয়ে অথবা পরস্পরের মধ্যে অতিরিক্ত কারণে বিএনপি সমর্থকরা নিজেদের ভিতর সংঘাত এড়াতে ভোট কেন্দ্রে যায়নি।এ কারণে, ভোটের শতকরা হার আশানুরূপ ছিল না।

সুতরাং সমস্যা ভোট কেন্দ্রকে ঘিরে নয়, প্রধান কারণ ছিল ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ বসে যারা মনোনয়ন বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারায় বনিবনা না হওয়ার প্রভাব পরে ভোট কেন্দ্রে। বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয় পেলে, কে প্রধানমন্ত্রী হবে, তা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন ২৮ জুলাইয়ে জনসভা থেকে ঘোষণা এলো বিএনপির প্রধান নেতা এখন তারেক রহমান। উনার বক্তৃতা শুনে মনে হলো বিএনপি ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে এবং তিনিই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। খুব সহসা দেশে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রমান করতে চেয়েছেন ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মত এবারের নির্বাচনে বিএনপিতে কেন নেতৃত্বের সংকট নেই।

এই জনসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সভার সভাপতির শেষ কথাটি। তারেক রহমানের বক্তৃতার পর মাইক যখন সভাপতিকে দেয়া হলো, তিনি ঘোষণা দিলেন পরবতী দিন ঢাকার প্রধান চারটি সড়কের মুখে বিএনপি অবস্হান কর্মসূচী পালন করবে এবং সবাইকে আসসালামুয়ালাইকুম বলে বিদায় নিয়ে মাইক ছেড়ে যখন তার বসার জায়গার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন বিএনপির স্হায়ী কমিটির একজন অন্যতম সদস্য চেয়ার থেকে উঠে এসে সভাপতির কাছে জানতে চাইলেন ‘এই লোকগুলোর এখন কি হবে?’ তখন সভাপতি বলেছিলেন ‘ আমি কি করব?’ এই দুজনের কথোপকথন ইউটিউবে আছে।

আমার ধারণা এখান থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে যে বিএনপিতে নেতৃত্বের কোন্দল চরমে গেছে। এই জন্যই বা হয়ত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে আগের চেয়ে বেশী বেশী যাচ্ছেন। হয়তবা, এই নেতৃত্বের কোন্দলই বিএনপি কে নির্বাচনে আনবে।

লেখক: প্রাক্তন সিনিয়র টেকনিকাল অফিসার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা