২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১:০৭
শিরোনাম:

গজারিয়া শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

গজারিয়া প্রতিনিধি:
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের স্লিপ, রুটিন মেরামত ও প্রাক প্রাথমিক বরাদ্দের অর্থ দিয়ে উপকরণ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

অভিযোগে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়ার মান উন্নয়ন ও বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে প্রতিবছর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্লিপ বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, রুটিন মেরামত বাবদ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রাক প্রাথমিক বরাদ্দ ১০ হাজার টাকা। এই বরাদ্দের টাকা বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সাথে রেখে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন উপকরণ সামগ্রী ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজ করার কথা সরকারি নীতিমালা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি বরাদ্দ আসলেই ওইসব টাকা স্ব-স্ব বিদ্যালয়ের ব্যাংক একাউন্টে প্রদান করে থাকেন উপজেলা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু  উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল কাদের মিয়া নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের পছন্দসই শিক্ষকদের দিয়ে এ সকল উপকরণ কম দামে ক্রয় করে প্রধান শিক্ষকদের কাছে তিনগুণ বেশিদামে বিক্রি করে আসছেন। তিনি গজারিয়া উপজেলায় যোগদান করে বলে বেড়াতেন আমার মেয়ে বিদেশে লেখাপড়া করে অনেক টাকার দরকার।  এ উপজেলায় কর্মরত থেকে উপকরণ বানিজ্য, ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা।

এছাড়া নিয়ম বহির্ভূত  বিদ্যালয়ে পরিদর্শন খরচ বাবদ প্রতি এক থেকে তিন হাজার টাকা করে নিয়ে আসছেন। কোনো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যদি টাকা দিতে দেরী করে তাহলে তাকে  হয়রানি করেন দালাল রূপে শিক্ষকদের মাধ্যমে   ওই শিক্ষা অফিসার। তার অধিনস্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা মোট ৮৭টি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জিম্মি করে এসব অবৈধ কাজ করে যাচ্ছেন  নিরবে। এ রকম কর্মকান্ড করে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনোড় শিক্ষক মুখ খুলতে সাহস পায়না।

সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ১২৯ জন শিক্ষকের শান্তি বিনোদন ভাতা প্রায় তিন লক্ষ ৩২ হাজার টাকা  অর্থ বরাদ্দ আসে। এসব অর্থ উত্তোলন করতে প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে  চারশত টাকা করে আদায় করেছে শিক্ষা কর্মকর্তা। তারা জানান, চলতি অর্থ বছরে উপজেলার  প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কার কাজের জন্য (শ্লিপের অর্থ) প্রত্যেক বিদ্যালয়ের অনুকূলে ৪০ হাজার টাকা করে অর্থ বরাদ্দ আসে। এসব অর্থ উত্তোলন করতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দুই হাজার পাঁচশ টাকা দিতে হয়েছে। শিক্ষকরা এই টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে নিজের অফিস খরচ এবং উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিস ম্যানেজের কথা বলেন ওই কর্মকর্তা।

 

 

প্রধান শিক্ষকরা জানান, প্রতিবছর উপজেলা শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ পালন করা হতো। জাতীয় এই দিবসটি পালন করার জন্য সরকারিভাবে নির্দেশনাও রয়েছে। যার জন্য সরকার প্রতি উপজেলায় ২১ হাজার টাকা অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ বছর গজারিয়াতে এ জাতীয়  দিবসটি পালন না করে ওই টাকা নিজেই আত্মসাৎ করেছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

 

 

তাছাড়া উপজেলা আন্তঃপ্রাথমিক ক্রীড়া প্রতিযোগীয় পুরস্কার বিতরণ করার জন্যও সরকার ১৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু ক্রীড়া প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হলেও কোন প্রকার পুরস্কার বিতরণ না করে সে টাকাও তিনি আত্মসাৎ করেছেন।

 

 

শিক্ষকদের অভিযোগ, উপজেলায় প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থীদের মডেল টেস্টের খাতা প্রত্যেক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়ার নিয়ম থাকলেও  সকল খাতা ও বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী বই নিয়ম বহির্ভূতভাবে সাতাশিটি বিদ্যালয়ে চার হাজার  পাঁচশত টাকা করে গোপনে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

38নং বাঘাইয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ভুয়া ভোট কেন্দ্র দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় ষাট হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

তার দুর্নীতি সহযোগিতা করতে  বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ও প্রধান শিক্ষকেরা জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্যালয়ের সময় সুচি অবস্থায় অফিসে এসে আড্ডা দিয়ে থাকে।এতে বিদ্যালয়ে  কমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, বিভাগীয় কর্মকর্তা চিত্ত বিনোদনের জন্য গজারিয়ায় মানাবে ওয়াটার পার্কে আসবে বলে বিদ্যালয়ে প্রধানদের নিকট থেকে এক হাজার টাকা করে আদায় করে শিক্ষা অফিসার। পরবর্তীতে বিভাগীয় প্রধান না আসায় সেই আদায়কৃত অর্থ ফেরত চাওয়ায় শিক্ষকদের জানায় একাউন্টস অফিসে বিল পাস করতে লাগবে তাই টাকা ফেরত দেওয়া যাবে না।  শিক্ষকদের কাছ থেকে কোন প্রকার টাকা রাখার বিধান না থাকলেও গজারিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে আমাদের কাছ থেকে টাকা রেখেছেন। হয়রানির ভয়ে আমরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারছি না।

ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য নয়টি বিদ্যালয়ের ২ লক্ষ টাকা করে ১৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ আসে সে অর্থ উত্তোলনের জন্য অফিস সহকারী নিলুফা আক্তার ও দালাল রূপে শিক্ষকদের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা করে দাবি করেছে এ শিক্ষা কর্মকর্তা।

প্রজ্ঞাপনের নিয়ম অনুযায়ী নতুন ভবন পাঁচ বছরের মধ্যে বরাদ্দ পেয়ে থাকলে নতুন করে  চাহিদা দিতে পারবে না শিক্ষা কর্মকর্তা। সেখানেও বহিভূত ক্ষুদ্র মেরামতের তালিকা দিয়ে বরাদ্দ নিয়েছে।

আরো নতুন করে এগারো টি বিদ্যালয়ের সংস্কারের জন্য বরাদ্দের তালিকা পাঠিয়েছেন।

 

 

একাধিক প্রধান শিক্ষক বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণের নামে অনেক শিক্ষকদের নিয়ম বহির্ভূত প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রশিক্ষণে বিরতি নেওয়া,  শিক্ষা অফিসার আমাদের কাছে  টাকা দাবি করেন। প্রথমে আমরা রাজি না থাকলেও পরবর্তীতে কর্মকর্তার অসৎ দাবি পূরণ করেই এসব কাজ করতে হয়েছে। দাবি পূরণ না করলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে।

 

 

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাদির মিয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে শিক্ষকরা যেসব অভিযোগ করেছেন তার সবগুলোই মিথ্যা। আমি কোন প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত নই।

 

 

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন  বলেন, গজারিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনিয়মের বিষয়টি  আমি জানিনা । তবে লিখিতভাবে আমাকে কেউ জানায়নি। তাছাড়া সবেমাত্র যোগদান করেছি। এ বিষয়ে অভিযোগ করলে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।