চাকরি জীবনের শেষ মুহুর্তে ঘুষ ও দুর্নীতিতে ব্যস্ত গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়ের
Rubel Sheikh, September 13, 2026 at 9:22 pm
বিশেষ প্রতিনিধি: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যেন তার কমিশনের হিসাবেই ভাগ হয়ে যায়—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের একটি প্রকল্পকে ঘিরে তার বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মেসার্স খান ট্রেডার্সের মিজানুর রহমান নামের এক পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি টাকার বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের। তবে এই একটি প্রকল্পই একমাত্র অভিযোগ নয়—দীর্ঘ চাকরিজীবনে গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালেও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন সদস্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে আশীর্বাদপুষ্ট প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার।
অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পেয়ে এসেছেন আবুল খায়ের। তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে গোপালগঞ্জ জোনে প্রভাবশালী পোস্টিং পান তিনি। সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আলম নামের এক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, প্রকল্পের কাজ ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর কমিশন প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন আবুল খায়ের। চট্টগ্রাম জোনে দায়িত্ব পালনকালে বড় প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে, যেখানে টেন্ডারকে ঘিরে একটি সুসংগঠিত ‘পার্সেন্টেজ শেয়ারিং’ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঠিকাদারদের বিল আটকে দেওয়া, কাজের অনুমোদন বিলম্বিত করা কিংবা ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ভয় দেখানো হতো। ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এই কমিশনের হার আরও বেড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়ায় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন, যে কারণে ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছে তিনি ‘মিস্টার ৫%’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সূত্র অনুযায়ী, আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হলো সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রাক্কলন, দরপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে প্রভাব খাটানো। রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে বড় প্রকল্পের টেন্ডার সিন্ডিকেট গঠন এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে একটি তদন্ত কমিটি।
এ ছাড়া কুমিল্লা জোনে দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে তার বিরোধের অভিযোগও রয়েছে, যার জেরে পরবর্তীতে তাকে কুমিল্লা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। জানা গেছে, ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতে দায়িত্ব পালনের সময় আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে এই অর্থের দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আবুল খায়েরকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তার ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, তার নিজের ও স্বজনদের নামে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া পূর্বাচল ও ন্যাশনাল হাউজিং এলাকায় জমি এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও খামারবাড়ি থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। একদিকে সরকারি প্রকল্পে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ, অন্যদিকে টেন্ডারে কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে অভিযোগের পরিধি যথেষ্ট বিস্তৃত।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর পরও তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা যথেষ্ট, কিন্তু বাস্তবে এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। তার ভাষায়, ছোটখাটো ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দু-একটি দৃষ্টান্ত দেখা গেলেও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তিনি মনে করেন, আইনের যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তার মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ বিভাগীয় পদক্ষেপ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর ভূমিকা নিলেই কেবল প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!