২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৪:২২

১০ই ডিসেম্বর বিএনপি-র রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে

সুভাষ দাশগুপ্ত

আগামী বছরের শুরু থেকে পবিত্র রমজান, ঈদুল আজহা এবং বর্ষা কালকে বিবেচনায় নিয়ে, বিএনপি সরকার পতনের এক যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বর্তমান সময়কে বেছে নেয়। আগামী বছরের শেষে যতই জাতীয় নির্বাচন খুব সন্নিকটে এসে যাবে ততই নির্বাচনের আগে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পতনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জানুয়ারী মাসের নির্বাচনের আগে যদি বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো না যায়, বিএনপির ধারণা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার তাদের আশা দুবাশায় পরিণত হতে পারে। তাই, তাদের প্রধান লক্ষ্য যেকোনো ভাবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান সরকারের পতন নিশ্চিত করা।

এখন কথা হচ্ছে কিসের ওপর ভরসা করে বিএনপি এই হিংস্র যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচী হাতে নেয়? ১মঃ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে আবারও এক ছাতার নিচে আনা, যেভাবে ওদের সহায়তায় ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল, এবারও সেই পথ যেন নিশ্চিত করা যায়। বলা প্রয়োজন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর, নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তকমা লাগাতে, বিএনপি ধর্মীয়- মৌলবাদ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির থেকে দুরত্ব বজায় রাখার এক কৃএিম রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেয়।কিন্তু, এতে করে তাদের ভিতর ভবিষ্যতে আবার এক সঙ্গে থেকে আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার ব্যাপারে অবিশ্বাসের জম্ম দেয়। এখন সময় এসেছে এদেরকে আবার কাছে টানা, কারন তারা এখনও এক বিরাট শক্তি। ২য়ঃ বিভিন্ন প্রকার নুন্যতম রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবর্জিত স্লোগান দিয়ে নিরীহ জনসাধারনকে কাছে টানার প্রচেষ্টা। তাদের স্লোগানের বিষয়বস্তু ছিল- ১০ই ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার নির্দেশে, শেখ হাসিনা পালানোর পথ পাবে না, ইতিমধ্যেই অনেক দূর্নীতিবাজ আওয়ামী লিগ নেতা দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি।৩য়ঃ শেষ বিভাগীয় সমাবেশ ডাকা হয়েছিল ১০ ই ডিসেম্বর ঢাকায়। তার কারন হচ্ছে এই দিন উদযাপন করা হয় বিশ্ব মানবতা দিবস। এই দিন, বিশ্বে যে সব দেশে (আমেরিকার মতে) মানবতা লংঘন করা হয় সে সব দেশের ওপর বিভিন্ন প্রকারের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

গত বছর (২০২১ সালে),বাংলাদেশের ৬ জন সরকারী উচ্চপদস্থ -কর্মকর্তাদের আমেরিকা প্রবেশ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং বিএনপি-র ধারণা ছিল এই বছরের (২০২২ সালের) নিষেধাজ্ঞার তালিকা আরও ব্যাপক ও কঠোর হবে, যা সরকার পতনের আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বিএনপি আশা করেছিল তাদের প্রত্যাশিত রিপোটে বাংলাদেশের ওপর দেয়া নিষেধাজ্ঞা সমুহ ১০ই ডিসেম্বর ঢাকার সমাবেশে পড়ে শোনানো হবে। এই ব্যাপারে লবি করার জন্য আমেরিকায় লোক পাঠানো হয়েছিল কিন্তু তিনি (তারা) খালি হাতে ফেরত আসে। ৪র্থঃ “ওরা ২২ জন”-র ওপর অগাধ আস্হা রাখা।

এরা হচ্ছে তারা যারা বিভিন্ন দেশে অবস্হান করে দিন-রাত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের ভিতর বিএনপি-র রাজনৈতিক কর্মকান্ডের তীব্র সমালোচনা; বাংলাদেশের ওপর মার্কিন নীতির তীব্র বিরোধীতা; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে অবস্হানের পরও এবারের রিপোটে কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না আশাতে “ওরা ২২ জন” অস্তিত্বের সংকটে আছে। এরা প্রায় সবাই “শেখ হাসিনার পতনের ঘোষক” সেজে বিবৃতি দিতে থাকে, তাদের প্রয়াত নেতার পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে। কেননা, তাদের কাছে শেখ হাসিনার পতন মানে দেশকে নতুনভাবে স্বাধীন করে আর এক পাকিস্তান গড়ে তোলা, যার প্রতিফলন দেখি বিএনপি-র দশ দফা দাবীতে।

বিএনপি-র এই আন্দোলনকে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাবার যে পরিকল্পনা গ্রহন করেছিল তাহল ঢাকার বাইরে অহিংস পথে ৯টি সমাবেশ করে সরকারকে দেখানো যে তাদের ঢাকার সমাবেশও অহিংস হবে। আসলে বিএনপি-র ঢাকা সমাবেশের মূল লক্ষ্য ছিল “শেষের থেকে আবার শুরু” করা। এই হিসাব বুঝতে আওয়ামী লিগের সময় লাগেনি। এতে করে বোঝা গেছে, বিএনপি-কে আওয়ামী লিগ থেকে রাজনীতি শিখতে হবে, বহু বছর ধরে।

২০১৩ সালের হেফাজত ইসলামের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিএনপি চেয়েছিল তাদের পল্টন অফিসকে অস্ত্র, খাদ্য ও আশ্রয়স্হল হিসেবে ব্যবহার করা, যাতে করে হেফাজতের মত পালাতে হলেও কিছু লোক যাতে করে ভিতরে অবস্হান নিয়ে পরিস্হিতি আরও জটিল করতে পারে। কিন্তু সরকারের অনঢ অবস্হানের কারণে এবং বিদেশীদের কথা শুনে পল্টনে সমাবেশ করা থেকে তারা যখন সরে আসে, তখন শুধু তাদের আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটেনি, এর সাথে সম্ভবতঃ বিএনপি-র রাজনৈতিক মৃত্যু ও ঘটেছে।

দেশের সাধারন ও নিরীহ জনগনের মধ্যে মিথ্যা রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া, যার সাথে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল নেই; “ওরা ২২ জন”-র নতুন “স্বাধীনতার ঘোষক” হবার চেষ্টা এবং সাধারন মানুষের মন জয় করার জন্য ২৪ ঘন্টা বিদেশ থেকে মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় নেয়া এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নিমিত্তে কিছু দেশ এবং দূতাবাস আইন বহির্ভুতভাবে দেশের আভ্যান্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে দেশের নিরীহ জনগনকে হিংশ্র রাজনীতির দিকে ধাবিত করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর যে অপপ্রয়াস চালিয়ে ছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে দেশ এক বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায়। তবে, ভবিষ্যতে যাতে এই অশুভ শক্তি আবার আঘাত হানতে না পারে, তার থেকে সমগ্র দেশবাসীকে আগের চেয়ে আরও অধিক সচেতন হতে হবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেয়।

লেখক: প্রাক্তন সিনিয়র টেকনিকাল অফিসার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা